মেজবাহউদ্দিন মাননুঃ কলাপাড়ায় এখন রাতের স্কুল জমজমাট। দিনের ক্লাশের চেয়ে রাতের স্কুলের শিক্ষার্থী উপস্থিতিও দ্বিগুন। সেখানে পাঠদানেও আন্তরিক রয়েছেন শিক্ষকরা। কলাপাড়া পৌর শহরে রাতের এসব স্কুলের পাশাপাশি ছোট-বড় ২০টিরও বেশি কোচিং সেন্টার রয়েছে। যেখানে দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছে। ক্লাশে দিনের পাঠদানের চেয়ে রাতের এই বিশেষ ক্লাশের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ অনেক বেশি। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মাসে এক থেকে দুই-তিন হাজার টাকা দিয়ে রাতের এসব স্কুলে চলছে পাঠদান। রাতে স্কুলের কক্ষগুলো শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে সরগরম থাকছে। দূর থেকে বিদ্যুতের আলোয় স্কুল ভবন ফকফকা দেখা যায় । কলাপাড়া শহরের নামিদামি স্কুলগুলোতে দিনে ক্লাশচলাকালীন শিক্ষার্থী উপস্থিতি বেশ হতাশাজনক। কিন্তু বিপরীত চিত্র রাতের স্কুলগুলোতে।
একই শিক্ষার্থী। একই শিক্ষক। একই পাঠ্যবই। কিন্তু দিনের ক্লাশে উপস্থিত থেকে পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ নেই কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে কয়েকজন শিক্ষার্থীর সরাসরি উত্তর-স্যারেরা স্কুলে দিনের ক্লাশে ঠিকমতো পড়ান না। কোচিংএ পড়া ভালোভাবে বুঝিয়ে দেন। পড়া আদায় করে নেন। অভিভাবকরাও একই মতামত ব্যক্ত করেন। আর এসব কারণে শিক্ষার্থীরা বলতে গেলে রাতের স্কুলনির্ভর হয়ে গেছে। আর প্রাইভেট তো আছেই। সেক্ষেত্রে সকাল থেকে রাত অবধি চলে। এ জন্য আবার মাসে গুনছেন শিক্ষার্থী পিছু পাঁচ-ছয় হাজার টাকা। অভিভাবকরা গেছেন জিম্মি হয়ে। বাধ্য হয়ে সন্তানেরর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে জিম্মিদশায় আটকে গুনছেন বাড়তি টাকা। কোন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাত দশটা পর্যন্ত ক্লাশ চলে। শিক্ষা বিভাগের এনিয়ে কোন দায় নেই। তারা নির্বিকার। যেন ফ্রিস্টাইল সিস্টেম চলছে। এমন শিক্ষা বাণিজ্যের কারণে বর্তমানে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত পরিবার চরম বিপাকে পড়েছেন। খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, বাসাবাড়িতে এখন আর সন্ধ্যার পরে টেবিলে কোন শিক্ষার্থীর দেখা মেলে না। কিন্তু রাতের স্কুলে শিক্ষার্থী উপস্থিতি জমজমাট। ক্লাশও গমগম। আবার রাতের স্কুল কিংবা ব্যাচ ভিত্তিক প্রাইভেট পড়তে রাজি না হলে কতিপয় শিক্ষকের রোষাণলে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের। আর পড়লে পরীক্ষায় বিশেষ সুযোগ দেওয়ার এন্তার অভিযোগ রয়েছে। অবস্থা এমন হয়েছে যে- এ জিম্মিদশা থেকে বের হওয়ার সমুহ কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না অভিভাবকরা। তারা মুখ খুলে সত্যটি পর্যন্ত বলতে ভয় পাচ্ছেন। রাতের কোচিং কিংবা স্কুল খোলা রাখার কোন বিধান না থাকলেও তা চরমভাবে উপেক্ষা করে চলে রাতের স্কুল। কেউ কেউ এ সিস্টেম কে শিক্ষা সন্ত্রাস বলেছেন। কলাপাড়া শহরে ইতিপূর্বে রাতের কোচিং সেন্টারে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে জেল জরিমানা করা হয়েছে। কিন্তু দমেনি প্রভাবশালী শিক্ষক সিন্ডিকেটের শিক্ষা বাণিজ্য। সাধারণ অভিভাবকরা এই শিক্ষাবাণিজ্যের অবসান চেয়েছেন। এমনকি অতিসম্প্রতি রাতের এমন একটি কোচিং সেন্টারে নবম-দশম শ্রেণির নয় শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। মানসিক চাপে এমনটি হয়েছে বলে অভিমত ছিল অভিভাবকদের।
কলাপাড়া মহিলা ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক নেছারউদ্দিন আহমেদ টিপু বলেন,‘ পড়াশোনা এখন বাণিজ্যিক হয়ে গেছে। শিক্ষকরা শ্রেণি কক্ষের চেয়ে প্রাইভেট অথবা কোচিংয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ জন্য কতিপয় শিক্ষক একটা সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। এখানে মূলত অর্থনীতির বিষয়টি জড়িত। এর থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে শ্রেণিকক্ষে যথাযথভাবে পাঠদানের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তা যদি করা না যায় তাইলে আগামি দিনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার অনেক কমে যাবে। দেখা যাবে, শিক্ষার্থীরা শুধু অ্যাকাডেমিক কারণে ভর্তি হবে। কিন্তু পড়াশোনা চলবে কোচিং অথবা প্রাইভেট ব্যবস্থা কেন্দ্রিক।’
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষাকর্মকর্তা মনিরুজ্জামন খান জানান, তিনি বিষয়টি কিছু কিছু অভিভাবকের কাছ থেকে মৌখিকভাবে শুনেছেন। বিষয়টি দেখবেন বলে জানান।