আপন নিউজ ডেস্কঃ লেখাপড়ার প্রতি আমার সব সময়ই প্রবল ঝোঁক ছিল। তবে হঠাৎ বিয়ে হয়ে যাওয়ায় এবং সংসারজীবনে প্রবেশের কারণে আর আমার লেখাপড়া এগোয়নি। মাত্র ১২ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে যায় আমার। আমার স্বামীর ছিল যৌথ পরিবার। যার কারণে যৌথ পরিবারের দায়িত্ব আমার মাথায় এসে পড়ে। বিয়ের কিছুদিন যেতে না যেতেই আমি প্রথম সন্তানের মা হই। এর ঠিক আড়াই বছর পরেই আমি দ্বিতীয় সন্তানের মা হই। পর্যায়ক্রমে আমি আট সন্তান লাভ করি। সবকিছু মিলিয়ে জীবন চলছিল আমার। তবে নিজের লেখাপড়া থেমে যাওয়াটা ছিল আমার অতৃপ্তির অন্যতম কারণ। এ সময় ভাবলাম যত কষ্টই হোক ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা করায়ে সু-প্রতিষ্ঠিত করবো। আল্লাহতায়ালা আমার সে আশাটা পূরণ করেছে। জীবনজয়ের এ গল্প মাহমুদা বেগম নামে এক সফল জননীর।
তাঁর প্রথম ছেলে মো. মঞ্জুরুল হোসেন মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিকে রেকর্ড মার্কস পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। এরপর সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগ থেকে এলএলবি, এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করে ১৮তম বিসিএসে সহকারী জজ পদে যোগদান করে।কর্মক্ষেত্রে তাঁর সততা ও যোগ্যতার অনন্য দৃষ্টান্তের কারণে বর্তমানে আইন ও বিচার বিভাগের সলিসিটর (জেলা ও দায়রা জজ) পদে কর্মরত রয়েছে। দ্বিতীয় ছেলে মো. মোস্তাক হোসাইন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে বর্তমানে দেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান এটিএন বাংলায় ব্যবস্থাপক (অনুষ্ঠান) পদে কর্মরত রয়েছে। তৃতীয় ছেলে মো. মুজাহিদ হোসাইন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছে। চতুর্থ ছেলে মো. মওদুদ হোসাইন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে এডভান্স বাংলাদেশের সত্ত্বাধিকারী হিসেবে ব্যবসা পরিচালনা করছে। ছোট ছেলে মো. মেহেদী হোসাইন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উপ-ব্যবস্থাপক (হিসাব) পদে কর্মরত রয়েছে এবং পাশাপাশি কর আইনজীবী হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছে। ছেলেদের পাশাপাশি তাঁর তিন কণ্যাও সফলতার সাথে দেশের সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জন করেছে। এর মধ্যে জেষ্ঠ্য কণ্যা মমতাজ মিলি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিদর্শক পদে কর্মরত রয়েছে। দ্বিতীয় কণ্যা মুর্শিদা জাহান সাথী ঢাকার স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিউ মডেল স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে কর্মরত রয়েছে। কনিষ্ঠ কণ্যা মেহবুবা মালা পড়াশোনা শেষ করে সংসার করছেন। তিন কণ্যার জামাইরাও সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে যাঁর যাঁর কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।
‘সফল জননী’ হিসেবে এতক্ষণ মাহমুদা বেগমের যে গল্প বলছিলাম তাঁর বাড়ি পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের নীলগঞ্জ গ্রামে। তিনি সফল জননী হিসেবে উপজেলা, জেলা এবং বিভাগীয় পর্যায়ে নির্বাচিত হয়েছেন। আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টায় পটুয়াখালীর শিল্পকলা অ্যাকাডেমিতে বেগম রোকেয়া দিবসে জীবন সংগ্রামী মাহমুদা বেগমের হাতে পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রেস্ট, সম্মাননাপত্র তুলে দেন। এ সময় পটুয়াখালী মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শিরিন সুলতানাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
পুরস্কার গ্রহন করে মাহমুদা বেগম কিছুটা আবেগতাড়িত হয়ে বলেন, 'যৌথ পরিবারের বোঝা এবং আট সন্তানকে লালন-পালন করে আমি রীতিমতো চোখে অন্ধকার দেখতে থাকি। আসলে আমার স্বপ্নটা ছিল আকাশছোঁয়ার। সে তো আর হয়নি। তবে আমি দমেও যাইনি। সন্তানদের পড়াশোনা এবং তাঁদের সু-প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্নের জাল বুনতে থাকি। যৌথ পরিবারের চাহিদা পূরণ এবং আমার সন্তানদের আমার স্বপ্নের মত বড় করার যুদ্ধে রাত-দিন পরিশ্রম করে একাকার হয়ে যাই। অবশ্য আমার স্বামী আমাকে পাশে থেকে সাহস এবং অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। আমি আমার স্বামীর এ ঋণ কখনোই ভুলতে পারবো না।'
সফল জননী হিসেবে এমন স্বীকৃতিতে তিনি আনন্দিত হয়েছেন ঠিকই, তবে তাঁর মনটাও এমন সময়ে দুঃখ ভারাক্রান্ত। গত দু'বছর আগে তাঁর স্বামী মো. মোতাহার হোসেন মাতুব্বর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন। তাঁর স্বামী একজন সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন। কথা প্রসংগে মাহমুদা বেগম বলেন, 'নানান চড়াই-উৎরাই পার করে আমার সন্তানেরা আজ নিজ নিজ কর্মস্থলে প্রতিষ্ঠিত। এদিক থেকে আমি সফল। তবে আমার স্বামী বেঁচে থাকলে আমার এমন খবরে খুব খুশী হতেন। আমার এই দীর্ঘ পথ চলা ততটা সহজ ছিলো না। আমার পরিশ্রম, ধৈর্য, মেধা এবং আমার ছেলে মেয়েদের অক্লান্ত চেষ্টায় আমি আজ সফল হয়েছি। আমার স্বপ্নকে আজ আমার পুত্র-কণ্যারা বাস্তবে রূপদান করেছে। তাই আমি মনে করি আমি একজন নারী যোদ্ধা এবং সফল জননী। বর্তমানে আমি, আমার ছেলে-মেয়ে এবং নাতী-নাতনী নিয়ে সৃষ্টিকর্তার অসীম কৃপায় সুখী দিন যাপন করছি।'
সফল জননী'র সম্মাননা অর্জন বিষয়ে তাঁর জেষ্ঠ্য পুত্র আইন ও বিচার বিভাগের সলিসিটর মো. মঞ্জুরুল হোসেন বলেন, 'আমার মায়ের সন্তানরা নিজ নিজ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত। এটা সত্যি, জীবনযুদ্ধের কঠিন সময়ে আমার মায়ের দৃঢ় মনোবল, অদম্য সাহস, সততার জন্য আমরা এতদূর আসতে পেরেছি। আসলে মায়ের ঋণ কখনই শোধ করা যায়না। আমাদের মায়ের জন্য আমরা গর্বিত।'