জিয়া স্মৃতি জাদুঘরে কিছুক্ষণ
বহু বার নানা কাজে চট্টগ্রাম ভ্রমণ করেছি। প্রতিবার যাবার আগে পরিকল্পনা ছিল জিয়া স্মৃতি জাদুঘরটি দেখার। কিন্তু চাটগাঁ পৌছে মন টানতো না। অনেকবার প্রস্তুতি নিয়েও যাওয়া হয়নি। সেখানে গিয়ে কি করে নিজ নয়নে দেখবো, একটি নির্মম হত্যাকান্ডের দৃশ্য? কারণ ওই স্থানেই ঘুমন্ত অবস্থায় নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা, সবুজ বিপ্লবের নায়ক, সার্কের স্বপ্নদ্রষ্টা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। যে কারণে সেখানে না গিয়ে বার বার ফিরে এসেছি। কিন্তু এবারের ভ্রমণে সহকর্মীর বিশেষ অনুরোধ রাখতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলাম ইতিহাসের একটি জগন্যতম হত্যাকাণ্ডের স্থানটি পরিদর্শনের।
শেষ বিকালে (৯ মার্চ ২০১৩ ) গাড়ির ড্রাইভারকে বলি, যেখানে জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হয়েছিল সেখানে নিয়ে যেতে। ড্রাইভার দ্রুত গতিতে গাড়ি চালিয়ে ছুটলো শহরের প্রাণকেন্দ্র কাজির দেউড়িতে। যাওয়ার পথে শহরের সিডিএ সড়কের উভয় পাশের নানা দৃশ্য দেখেছিলাম। আর ভেবেছিলাম কি করে দেখবো ইতিহাসের একটি নির্মম হত্যাকাণ্ডের দৃশ? ভাবতে ভাবতে মন ভীষণ খারাপ হয়ে যায়।
গাড়ি থেকে নেমে সহকর্মী সাংবাদিকতার কার্ড দেখিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। তবে আমি টিকিট কেটে পাহাড়ের উপর অবস্থিত জিয়া স্মৃতি জাদুঘরে প্রবেশ করি। সহকর্মী ভবনটির কারুকার্য দেখে ভীষণ উৎফুল্ল। এটি ব্রিটিশ আমলে নির্মিত সার্কিট হাউজ। তবে আমার মন কতটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল তা লিখে প্রকাশ করা যাবে না।
দ্বিতল ভবনের নিচ তলায় প্রবেশ করেই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জিজ্ঞেস করি, কোন রুমে হত্যা করা হয়েছিল আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতিকে? তিনি হাত দিয়ে সামনে এগিযে যাবার নির্দেশ করেন। এক একটি রুমে প্রবেশ করি আর চোখে পড়ে- দেয়ালে জিয়াউর রহমানের পরিহিত অতি সাধারণ পোষাকসহ ব্যবহৃত নানা জিনিসপত্র। তাঁর হাতে লেখা ডায়েরি। দেশ বিদেশে নানা কর্মকাণ্ড স্মৃতি দিয়ে সাজানো মৃত উপত্যাকা। সিড়ি বেয়ে যত উপরের দিকে উঠেছি মন ততই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। এক পর্যায় পৌছাই দ্বিতীয় তলায় সেই কক্ষে! যেখানে জীবনের শেষ বারের মত ঘুমিয়ে ছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। রুমটির মাঝখানে একটি খাট রয়েছে। তার পাশে সোফা, দেয়ালে রয়েছে একটি আর্ট করা পাঞ্জাবি ও পাজামা পড়া ছবি (সেই রাতে যে পোশাকে ছিলেন)।
ওই রুমের উত্তর পাশে রয়েছে একটি স্টেচার। যাতে বহন করা হয়েছিল জিয়াউর রহমানের লাশ। তার পাশে একটি রক্ত মাখা কার্পেট। ওই দৃশ দেখার পর দ্রুত কক্ষের বাহিরে পূর্ব পাশে বের হই। সেখানে বিশাল খোলা জায়গা। সামনে বেলকুনি। সেখানে দাঁড়িয়ে ভেবেছি কি করে ঘাতকরা এমন সাদা সিদে একজন রাষ্ট্রপতিকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যা করেছিল? এমন সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন আমাকে মেঝের দিকে ইঙ্গিত করলেন। প্রথমে আমি শঙ্কিত হই। পরে তিনিই বললেন, মেঝেতে এগুলো গুলির চিহ্ন। আমার মনে হয়, ঘাতকরা জিয়াউর রহমানকে দরজা খুলতে বলেছিলেন। এর পর প্রেসিডেন্ট জিয়া দরজা খুলে বের হয়ে আসতেই এলোপাতাড়ি গুলি করেছিল ঘাতকরা। দরজার পাশে দেয়ালে রক্ত ছিটে পড়েছিল। যা এখনো সংরক্ষিত আছে।
ওই দৃশ দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারিনি। সহকর্মীকে রেখে দ্রুত নিচে নেমে আসি। আর বার বার নিজেকে প্রশ্ন করি, দেশের রাষ্ট্রপতি হয়েও কেন তিনি অরক্ষিত স্থানে রাত যাপন করেছিলেন? কাজ শেষ করে কেন তিনি ঢাকায় ফিরে যাননি? মুহূর্তেই ভাবি, তিনি ছিলেন জনতার জিয়া। তিনি দেশ ও দেশের জনগনকে ভালবাসতেন। সে কারণেই জনগনের সুখ দুঃখ উপলব্দি করার জন্য ছুটে যেতেন গ্রাম থেকে গ্রামে। জীবন যাপনও করেছেন গ্রামের অতি সাধারণ মানুষের মত।
বর্তমান প্রজন্ম জাদুঘরটি দেখলেই বুঝতে পারবে জিয়াউর রহমান কত সাধারণ জীবন যাপন করতেন।
জাদুঘর ত্যাগ করার আগে মনে মনে বলি, জিয়াউর রহমানকে তো হত্যা করা হয়নি, হত্যা করা হয়েছে একটি স্বনির্ভর জাতি গঠনের স্বপ্নদ্রষ্টাকে। যদি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা না হত, তা হলে আমরা পেতাম একটি স্বনির্ভর আধুনিক বাংলাদেশ।
প্রসঙ্গত, জিয়াউর রহমানকে হত্যার কিছু দিন আগে কলাপাড়া উপজেলার মিঠাগঞ্জ ইউনিয়নে আমাদের গ্রামের বাড়ির পাশে নিজ হাতে খাল খনন করে ছিলেন। আমার পরিবার ছিল খনন কাজের তদারকির মূল দায়িত্বে। জিয়াউর রহমান খুশি হয়ে প্রয়াত শাহজাহান মিয়া দাদাকে (মাঝা ভাই) একটি টেলিভিশন গিফট করে ছিলেন।
হাই স্কুলের মাঠ থেকে স্পিডবোটে প্রেসিডেন্টের বহরে বাবার সাথে আমিও গিয়েছিলাম খাল খনন অনুষ্ঠানে। প্রেসিডেন্ট আমাকে কোলে তুলে আদর করে ছিলেন। শিশু মনে ভীষণভাবে এর প্রভাব পড়ে। আমার ও মায়ের পরিবারের সবাই জিয়া প্রেমিক। তাদের দেখে আমিও প্রেসিডেন্ট জিয়ার ভক্ত হয়ে যাই।
জিয়াউর রহমানকে হত্যার দিন আমাদের বাড়িতে মায়ের কাজিন বেড়াতে আসে। হত্যাকারীদের নামে তার নাম হওয়ায় আমি তাকে পুলিশে ধরিয়ে দিতে বলি। দাদার বন্দুক দিয়ে তাকে গুলি করে মেরে ফেলতে বলি। এ কথা আমার স্মরণ না থাকলেও বড় হয়ে বাবা ও মায়ের কাছে শুনেছি। মহান নেতার শাহাদাৎ বার্ষিকীতে তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।
লেখকঃ নূরুজ্জামান মামুন, কানাডা প্রবাসী গণমাধ্যমকর্মী।