রবিবার, ২৫ Jul ২০২১, ০৫:৪৪ অপরাহ্ন

ফলোআপ; আমতলীতে আসামীর মৃত্যুর ঘটনায় বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন

ফলোআপ; আমতলীতে আসামীর মৃত্যুর ঘটনায় বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন

মোঃ জসিম উদ্দিন সিকদার, আমতলীঃ
বরগুনার আমতলী থানা হাজতে সন্দেহভাজন আসামী শানু হাওলাদারের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে বরিশাল বিভাগীয় পুলিশ কমিশনার-ডিআইজি মোঃ শফিকুল ইসলাম বিপিএম (বার) পিপিএম অতিরিক্ত ডিআইজি একেএম এহসান উল্লাহকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট উচ্চ পর্যায়ের বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। শনিবার তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি আমতলী থানা পরিদর্শন করেছেন। বরিশাল রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি তদন্ত কমিটির প্রধান একেএম এহসান উল্লাহ বলেন, ডিআইজি স্যারের নির্দেশে ঘটনা তদন্তে সরেজমিন পরিদর্শন করেছি। ডিআইজি স্যার কঠোর অবস্থানে আছেন। তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জানাগেছে, উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়নের পশ্চিম কলাগাছিয়া গ্রামে গত বছর ৩ নভেম্বরে ইব্রাহিম নামের একজন কৃষককে হত্যা করে দুর্বৃত্ত্বরা। ওই হত্যা মামলায় শানু হাওলাদারের সৎ ভাই মিজানুর রহমান হাওলাদার এজাহারভুক্ত আসামী। ওই মামলার শানু হাওলদারকে গত সোমবার রাত সাড়ে এগারটার দিকে সহেন্দভাজন আসামী হিসেবে আমতলী থানা পুলিশ ধরে নিয়ে আসে। তাকে ধরে নিয়ে আসার পর আমতলী থানা ওসি আবুল বাশার ও ওসি (তদন্ত) মনোরঞ্জন মিস্ত্রি আসামীর পরিবারের কাছে তিন লক্ষ টাকা চাঁদা দাবী করেন। ওই টাকা দিতে অস্বীকার করে তার পরিবার। টাকা না পেয়ে আসামী শানু হাওলাদারকে থানা হাজতে রেখে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের নামে শারীরিক নির্যাতন করে। নির্যাতন সইতে না পেয়ে আসামীর ছেলে সাকিব হোসেন গত মঙ্গলবার ওসি আবুল বাশারকে ১০ হাজার টাকা ঘুষ দেয়। কিন্তু তাতে তিনি তুষ্ট হয়নি। নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দেয়। বুধবার পরিবারের লোকজন এসে আসামী শানু হাওলাদারের সাথে দেখা করতে চাইলে পুলিশ দেখা করতে দেয়নি উল্টো পরিবারের লোকজনের সাথে অশ্লীল আচরন করে তাড়িয়ে দেয় এমন অভিযোগ নিহতের ছেলে সাকিব হোসেনের। বৃহস্পতিবার সকাল  সোয়া ছয়টার দিকে  আসামী শানু ওয়াস রুমে যাওয়ার কথা বললে পুলিশ তাকে ওয়াশ রুমে নিয়ে যায়। পরে এক ফাঁকে আসামী শানু হাওলাদার ওসি (তদন্ত) মনোরঞ্জন মিস্ত্রির কক্ষে ফ্যানের সাথে রশি পেচিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে এমন দাবী ওসির আবুল বাশারের।
ঘটনা তদন্তে বরিশাল বিভাগীয় পুলিশ কমিশনার-ডিআইজি মোঃ শফিকুল ইসলাম বিপিএম (বার) পিপিএম রবিশাল রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি একেএম এহসান উল্লাহকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট উচ্চ পর্যায়ের বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বরিশাল রেঞ্জের পুলিশ সুপার মোঃ হাবিবুর রহমান ও বরগুনা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোঃ শাহজাহান হোসেন। এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিহত শানুর একটি নির্যাতনে আঘাতের চিহৃ সংযুক্ত ছবি ভাইরাল হয়েছে। ওই ছবিতে শানুর হাত, পা, রান,বুক, পিঠ ও বাহুতে আঘাতের চিহৃ রয়েছে।
অপর দিকে আমতলী থানার প্রত্যাহাকৃত ওসি আবুল বাশার ও সাময়ীক বরখাস্তকৃত ওসি (তদন্ত) মনোরঞ্জনের কথোপকথনে ধু¤্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। ওসি আবুল বাশার ও ওসি (তদন্ত) মনোরঞ্জনের কথায় ঘটনার কোন মিল খুজে পাওয়া যাচ্ছে না।
সাময়ীক বরখাস্তকৃত মনোরঞ্জন মিস্ত্রি মুঠোফোনে বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ছয়টার দিকে আমি সংবাদ পেয়ে থানায় আসি। ওই সময় ওসি আবুল বাশার স্যারসহ অনেক পুলিশ ছিল। তাদের উপস্থিতিতে আমরা কুড়াল দিয়ে তালা ভেঙ্গে শানুর মরদেহ উদ্ধার করি। তিনি আরো বলেন, বুধবার রাত ৩টা পর্যন্ত আমি সহকারী পুলিশ সুপার স্যার (আমতলী- তালতলী সার্কেল) সৈয়দ রবিউল ইসলাম ও ওসি আবুল বাশার আসামী শানু হাওলাদারকে থানায় বসে জিজ্ঞাসাবাদ করি। রাতে শানুকে মাছ দিয়ে ভাত খেতে দেই। রাত তিনটার সময় আমরা তিনজন চলে যাই। সকাল ৬ টায় সংবাদ পাই শানু হাওলাদার গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। আমি আসার আগে বাশার স্যার থানায় আসেন। আমরা জানালা দিয়ে দেখতে পাই শানু হাওলাদার ফ্যানের সঙ্গে ঝুলতেছে। তখন আমরা দরজা ভেঙ্গে ভিতরে ঢুকি। তিনি আরও বলেন, ওই রাতে ডিউটিতে ছিল এএসআই আরিফ। রাতে হয়ত কোন এক সময় আরিফ ঘুমিয়ে ছিল। সকাল ৬ টায় কনষ্টেবল মনির ডিউটি শেষে কনষ্টেবল সাইদুলকে ডিউটি বুঝিয়ে দেয়। সাইদুল নিহত শানু হাওলাদারকে সকাল পৌনে ৬টায় থানা হাজত থেকে ওয়াশ রুম নেয়। তাকে ওয়াশ রুমে রেখে সাইদুল জাতীয় পতাকা উড়াতে যায়। এই ফাঁকে শানু হাওলাদার ওয়াশ রুম থেকে বের হয়ে হয়ত বা আমার কক্ষে রশি দিয়ে গলায় ফাসঁ দেয়। শানু হওলাদার কী ভাবে ফ্যানের সঙ্গে রশি দিয়ে ফাসঁ দিল। এমন প্রশ্নে মনোরঞ্জন মিস্ত্রি বলেন, কিভাবে যে রশি সংগ্রহ করেছে সেটাই তো চিন্তা করতে পারছি না। শানুর হাতে হাত কড়া নেই কেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, লেট্রিনে নেয়ার সময় হাত কড়া পরানো হয় না। টেবিল, চেয়ার ও ফাইল সব কিছু ঠিক ছিল। এমনকি মৃত্যুর সময় শানু হাত পা পর্যন্ত নাড়াচারা করেছে এমন কোন আলামত দেখা যায় না। এর কারন কি। তিনি বলেন, আমি কিছুই বলতে পারছি না। আমি তো ছিলামই না। সকালে এসে কুড়াল দিয়ে দরজার ছিটকানি ভেঙ্গে ফেলি। তারপর দেখি টেবিলটা এক পাশে। শানুর লুঙ্গিটা নিচে পরে আছে। তিনি আবার বলেন, সাইদুল ওয়াশ রুম থেকে শানুকে বের করে আমার রুমে রাখে। আবার বলেন, শানুকে ওয়াশ রুমে রেখে সাইদুল ফ্লাগ উড়াতে গেছে। এই ফাঁকে শানুতো পালিয়ে যেতে পারতেন। এমন প্রশ্নের জবাবে মনোরঞ্জন মিস্ত্রি বলেন, সাইদুল তো মনে করেছে থানার দোতলা থেকে পালিয়ে যেতে পারবে না। তিনি আরও বলেন. শানুর বিরুদ্ধে ২০০৩ সালে একটি হত্যা মামলা ছিল। বর্তমানে কোন মামলা নেই। ২০১৯ সালে ইব্রাহীম হত্যা মামলার সন্দেহভাজন আসামী হিসাবে শানুকে আমি বুধবার রাতে গ্রেফতার করি।
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল বাশার মুঠোফোনে বলেন, বুধবার রাতে শানুকে যখন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তখন এএসপি সৈয়দ রবিউল স্যার ও মনোরঞ্জন ছিল। আমি ছিলাম না। এই ঘটনার পরপরই এসপি স্যারকে জানাই। তার আসার আগেই আমরা দরজা ভেঙ্গে ফেলি। শানু আত্মহত্যা করেছে রশি পেল কোথায়। জানতে চাইলে আবুল বাশার বলেন, রশি বাথরুমে ছিল। অথবা আশ পাশে ছিল। শানুর হাতে হাতকড়া কেন ছিল না? এমন প্রশ্নে আবুল বাশার বলেন, এক হাতে হাতকড়া ছিল। (মরদেহে হাত কড়া দেখা যায়নি) আবুল বাশার বলেন, কনষ্টেবল সাইদুলের ডিউটি শেষ। কনষ্টেবল মনির এসে পতাকা উড়াতে যায় ৬-১৪ মিনিটে। পতাকা  উড়ায়ে তদন্ত কর্মকর্তার রুমে থাক্কা দেয়। আমি সংবাদ পেয়ে থানার তিনতলা থেকে নিচে নামি। পাশেই একটি কুড়াল ছিল। আমি কুড়াল দিয়ে দরজা ভেঙ্গে ফেলি। সাইদুল কেন শানুকে তদন্ত কর্মকর্তার রুমে ঢুকালো? আপনারা রাত তিনটা পর্যন্ত শানু হাওলাদারকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। এমন প্রশ্নের জবাবে আবুল বাশার বলেন, রাতে আমি ছিলাম না। শানু কী ভাবে ফ্যানের সঙ্গে রশি লাগালো, জানতে চাইলে তিনি বলেন, টেবিল ছিল।
তদন্ত কর্মকর্তা ও (আমতলী-তালতলী সার্কেল) এএসপি সৈয়দ রবিউল ইসলামকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
নিহত শানুর স্ত্রী ঝরনা বেগম বলেন, আমার স্বামীকে যখন গোসল করানো হয়। তখন তার শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহৃ পাওয়া গেছে। পুলিশের আঘাতে আমার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে। তিনি আরো বলেন দ্রুত সময়ের মধ্যেই আমি মামলা করবো।
নিহত শানু হাওলাদারের ছেলে সাকিব হোসেন বলেন, তিন লক্ষ টাকা ঘুষ দাবী করেন ওসি আবুল বাশার। ওসির দাবীকৃত ঘুষের টাকা দিতে অস্বীকার করায় আমার বাবাকে শারীরিক নির্যাতন করেছে। আমার বাবার শরীরের এমন কোন স্থান নেই যেখানে আঘাতের চিহৃ নেই। আমার বাবার নির্যাতনকারী ওসি আবুল বাশারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করছি। তিনি আরো বলেন, ওসি আবুল বাশারকে রক্ষার জন্য যেন প্রত্যাহার না হয়। পুলিশের উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার দাবী জানাই।
বরিশাল রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি তদন্ত কমিটির প্রধান একেএম এহসান উল্লাহ বলেন, ডিআইজি স্যারের নির্দেশে ঘটনা তদন্তে সরেজমিন পরিদর্শন করেছি। ডিআইজি স্যার কঠোর অবস্থানে আছেন। তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2017 aponnewsbd
error: সাইটের কোন তথ্য কপি করা নিষেধ!!