শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ১২:২৭ পূর্বাহ্ন

ভর্তির সাফল্যের পরও শেখার সংকট: প্রাথমিক শিক্ষায় মান, বৈষম্য ও প্রযুক্তির বাস্তবতা
বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা গত দুই দশকে বিস্তৃতভাবে এগিয়েছে; এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। প্রায় শতভাগ শিশুর বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত হওয়া, বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ এবং উপবৃত্তি কর্মসূচি এই অগ্রগতির দৃশ্যমান দিক। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের Annual Primary School Census 2023 অনুযায়ী দেশে প্রাথমিক পর্যায়ে ভর্তির হার প্রায় ৯৭ শতাংশের কাছাকাছি। পরিসংখ্যানগতভাবে এটি একটি বড় সাফল্য। কিন্তু এই সাফল্যের ভেতরেই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি লুকিয়ে আছে; শিশুরা আসলে কতটা শিখছে?
প্রাথমিক শিক্ষা শুধু বিদ্যালয়ে প্রবেশের নাম নয়; এটি শিশুর মানসিক বিকাশ, চিন্তাশক্তি এবং সামাজিক আচরণ গঠনের ভিত্তি। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, অনেক ক্ষেত্রেই শেখার প্রক্রিয়া এখনো মুখস্থনির্ভর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক। ইউনিসেফ বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রাথমিক স্তরের একটি বড় অংশ শিশু ন্যূনতম পাঠ্যদক্ষতা ও গণিত দক্ষতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। এই পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিকভাবে “learning crisis” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, যেখানে স্কুলে উপস্থিতি থাকলেও কার্যকর শেখা নিশ্চিত হচ্ছে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, শিশুদের শেখার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতি সবচেয়ে কার্যকর। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে এখনো অনেক জায়গায় শিক্ষক-কেন্দ্রিক পাঠদান এবং পরীক্ষাভিত্তিক চাপই প্রাধান্য পাচ্ছে। এর ফলে শিশুর স্বাভাবিক কৌতূহল ও সৃজনশীলতা অনেক ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একজন শিক্ষা গবেষকের ভাষায়, “শেখা যদি আনন্দের পরিবর্তে চাপের অভিজ্ঞতা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশই ব্যাহত হয়।”
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো গ্রামীণ ও শহুরে বৈষম্য। BANBEIS-এর শিক্ষা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গ্রামীণ বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত ঘাটতি এবং শিক্ষাসামগ্রীর সীমাবদ্ধতা এখনো বিদ্যমান। একইসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের Bangladesh Education Sector Review 2022 প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা মৌলিক পাঠ ও গণিত দক্ষতায় শহরের শিক্ষার্থীদের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। এই বৈষম্য কেবল শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান ও সামাজিক গতিশীলতার ওপরও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে। একজন শিক্ষা বিশ্লেষকের ভাষায়, “শিক্ষার সুযোগ যদি ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে, তবে তা সমাজে অসমতা আরও গভীর করে।”
এই বাস্তবতার মধ্যে প্রযুক্তি প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ উদ্যোগের আওতায় অনেক বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, আইসিটি ভিত্তিক কনটেন্ট এবং ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হয়েছে (ICT Division)। ইউনেস্কোর গবেষণা অনুযায়ী, সঠিকভাবে ব্যবহার করা হলে প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের ধারণক্ষমতা ও শেখার আগ্রহ বাড়াতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, এই সুবিধা এখনো সর্বত্র সমানভাবে পৌঁছায়নি। অনেক বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব রয়েছে, ফলে প্রযুক্তির সুফল সীমিত থেকে যাচ্ছে। একজন ICT প্রশিক্ষকের মন্তব্য অনুযায়ী, “প্রযুক্তি শিক্ষাকে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু শিক্ষক ও পরিবেশ ছাড়া এটি কার্যকর শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না।”
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে প্রায় সর্বজনীন ভর্তি, অন্যদিকে মানগত দুর্বলতা ও বৈষম্যের বাস্তবতা। প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও তা এখনো অসমভাবে বিতরণ হচ্ছে। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো- শুধু ভর্তি নয়, বরং শেখার মান, শিশুর মানসিক বিকাশ এবং শিক্ষার সমতা নিশ্চিত করা। কারণ প্রাথমিক শিক্ষা যদি শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে পারে, তবে সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো ভবিষ্যৎ বাংলাদেশও হবে আরও দক্ষ, মানবিক এবং টেকসই।
লেখক
কাউছার হামিদ
উপজেলা নির্বাহী অফিসার, কলাপাড়া, পটুয়াখালী।
© All rights reserved 2022 © aponnewsbd.com
Leave a Reply