রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৫৮ অপরাহ্ন
কুয়াকাটায় গার্ডার ব্রিজ: পর্যটন বিকাশের পাশাপাশি নিরাপদ হবে জেলে পরিবার
মেজবাহউদ্দিন মাননুঃ কুয়াকাটা সৈকতের সূর্যোদয় পয়েন্ট গঙ্গামতি সৈকতে যেতে এখন আর ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হবে না। দীর্ঘ প্রতিক্ষার পরে বেড়িবাঁধ সড়কপথে গার্ডারব্রিজ পেরিয়ে সোজা গঙ্গামতি সৈকতে পৌছানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে পর্যটক দর্শনার্থীর ভোগান্তি লাঘব হচ্ছে। পাশপাশি গঙ্গামতি বেড়িবাঁধের বাইরের তিন শতাধিক জেলে পরিবারের দূর্যোগকালে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌছানোর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। আগামি ডিসেম্বর মাসে বেড়িবাঁধ ও বাইরের গঙ্গামতি সৈকতে বসবাস করা মানুষের এই ভোগান্তি লাঘব হচ্ছে। বাঁধঘেষা খালটির ওপর ৩০মিটার একটি গার্ডার ব্রিজ করায় সেখানকার মানুষসহ পর্যটকদের নির্বিঘ্ন বিচরণ নিশ্চিত হতে যাচ্ছে।
ব্রিজটির মূল নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে চলছে সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ। এটি চালু হলে কুয়াকাটার বিভিন্ন পর্যটন স্পটের মধ্যে যোগাযোগ সহজ হওয়ার পাশাপাশি দুর্যোগের সময় বেড়িবাঁধের বাইরের বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে দ্রুত পৌঁছানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে। ব্রিজটির সংযোগসড়কের বাঁধের পার্শ্বে দুইদিকে পর্যটকের গাড়িসহ যানবাহন পার্কিংয়ের জন্য ৫৫ মিটার এলাকা নান্দনিকভাবে (পার্কিংজোন) করার কাজ চলছে। এখন সংযোগ সড়কের কাজ শেষ হলে বাঁধের বাইরের জনগোষ্ঠীর যোগাযোগসহ পর্যটকের ভোগান্তি লাঘব হতে যাচ্ছে। বর্তমানে কুয়াকাটা সৈকতের শুন্যপয়েন্ট থেকে গঙ্গামতি সর্যোদয় পয়েন্টে সাগরে ভাটার সময় যেতে হয়। জোয়ারে ওয়াকিং জোন নেই। প্লাবনভূমিতে পরিণত হয়। আর গঙ্গামতির এই গার্ডারব্রিজটি সচল হলে সবসময় গঙ্গামতি সূর্যোদয় স্পটে পর্যটকরা সবসময় যেতে পারবেন। ব্রিজটির ওপারে পুরনো প্রায় ১২ শ’ মিটার সড়কটির উন্নয়ন কাজও শীঘ্রই শুরু হচ্ছে। কলাপাড়া উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) মো: মনিরুজ্জামান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
রবিবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ব্রিজের নিচে গঙ্গামতির ওই খালে গোসল করছিলেন বাঁধের বাইরের বাসীন্দা ৫০ বছর বয়সী মোশাররফ বিশ্বাস। জানালেন, তিনি বাঁধের বাইরে খালের দক্ষিণ পাড়ে ৪০টি বছর বসবাস করছেন। জানালেন তিনি, এই খালটিতে এখনও ৩-৪ ফুট পানি। আমরা গোসল করি। রান্নার কাজ করি। স্থানীয়ভাবে এই খালটিকে গঙ্গামতির খাল বলা হয়। খালটির সঙ্গে গঙ্গামতির লেকের সংযোগ রয়েছে। তবে অনেকে বাঁধ দিয়ে মাছের চাষ করছে বলেও জানালেন মোশাররফ বিশ্বাস। তিনি আফসোস করে বললেন, ‘ সিডরের সময় পানির চাপ সইতে না পেরে তার ভাইরে ছেলে দুই বছরের কালাচান বাবা-মায়ের হাত থেকে ছুটে গিয়ে মারা গেছে। খালটিতে স্রোতের চাপ ছিল। সাতরে সবাই বাঁধের ভেতরে আশ্রয় নিতে আসছিলেন। তখন এই ব্রিজটি হলে এমন মৃত্যু হতো না। মোশাররফ বিশ্বাসের ভাষ্যমতে বাঁধের বাইরে প্রায় ৬০০ ভোটার। অন্তত ৪শ’জেলে পরিবারের দেড় সহস্রাধিক মানুষের চলাচলের পথ সহজ করবে এই ব্রিজটি।
ব্রিজের নিচের খালের পানিতে ডুবাচ্ছিল সাত বছরের শিশু রবিউল। জানালো, এখন আর তার স্কুলে যেতে সমস্যা হবে না। প্রথম শ্রেণির ছাত্র এই রবিউল জানায়, তারা বর্ষার কয়মাস অনেক সমস্যার মধ্যে থাকে। খালটিতে অনেক সমস্যা ছিল। স্কুলে যেতে পারত না।
স্থানীয় বাসীন্দা মুসা বিশ্বাস জানালেন, তাঁদের প্রায় ৪০ বছরের দূর্ভোগের শেষ হবে ব্রিজটি চালু হলে। একই কথা বললেন, মো: মহসিন, মো. দেলোয়ার হোসেন। মিজানুর রহমান জানালেন, একটা মহল মূলত এই ব্রিজটি যেন না হয় এজন্য প্রচার করেছে খাল নেই। সংযোগ সড়ক নাই। কোটি টাকার ব্রিজ কেন করা হয়েছে-এমন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
বর্তমানে কুয়াকাটা জিরো পয়েন্ট থেকে পশ্চিম দিকে লেম্বুরবন পর্যন্ত সৈকত ধরে চলাচলে তেমন সমস্যা হয় না। তবে গঙ্গামতি পর্যন্ত যেতে হলে জিরো পয়েন্ট থেকে সৈকত ধরে যেতে হয়। নতুন ব্রিজটি চালু হলে ৩৩ কানি-সংলগ্ন এলাকা থেকে সরাসরি সৈকতে পৌঁছানো যাবে। এতে পর্যটকদের চলাচলের বিকল্প পথ তৈরি হবে এবং সৈকতের বিভিন্ন অংশে যাতায়াত আরও সহজ হবে।
ব্রিজটির গুরুত্ব শুধু পর্যটনেই সীমাবদ্ধ নয়। বেড়িবাঁধের বাইরে বসবাসকারী দেড় সহস্রাধিক জেলে জনগোষ্ঠীর যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বর্ষা মৌসুমে তুলাতলি খালে ৫ থেকে ৮ ফুট পানি থাকে। তখন খাল পার হয়ে বেড়িবাঁধের ভেতরে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ে। ব্রিজটি চালু হলে এ সমস্যা অনেকটাই দূর হবে। বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়সহ দুর্যোগের সময় বেড়িবাঁধের বাইরের বাসিন্দারা দ্রুত বাঁধের ভেতরে অবস্থিত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারবেন।
তিন কোটি ১৫ লাখ ৫৯ হাজার টাকা ব্যয়ে ২০২১ সালের ১৭ আগস্ট ঠিকাদার মো. মহিউদ্দীন আহমেদকে কার্যাদেশ দেয়া হয়। ব্রিজটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০২৪ সালের পর কাজ বন্ধ থাকলেও সম্প্রতি আবার সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে।
এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “এটি বাস্তবতার নিরিখে কুয়াকাটার উন্নয়নে করা হয়েছে। পর্যটকরা দ্রুত আরেকটি স্পট থেকে সৈকতে যাওয়ার পাশাপাশি বেড়িবাঁধের বাইরের জনগোষ্ঠী দ্রুত বাঁধের ভেতরে আসা-যাওয়া করতে পারবেন। আর খালটি বর্ষায় ৫-৮ ফুট পানিতে ডুবে থাকে।”
ব্রিজটি চালু হলে কুয়াকাটার পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের শত শত জেলেদের দৈনন্দিন যোগাযোগ, দুর্যোগকালীন নিরাপত্তা এবং সৈকতের বিভিন্ন অংশে পর্যটকদের যাতায়াতের ক্ষেত্রে বহুমুখী সুবিধা সৃষ্টি হবে। তবে স্থানীয়রা জানান, পর্যটন এলাকার সৌন্দর্য বর্ধনে খালটি খনন করা দরকার। নইলে ভরাট খাল দখল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ২০১৯-২০২৬ © aponnewsbd.com
Leave a Reply