বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬, ১১:৫৯ অপরাহ্ন

পিতা-মাতারা ছাত্রদলের নেতৃত্বে! বিএনপি কোন পথে?
নূরুজ্জামান মামুনঃ শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ৪১ বছর বয়সে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। জিয়াউর রহমানের স্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ৩৮ বছর বয়সে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হন। তিনি ৪৫ বছর বয়সে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান ৩৪ বছর বয়সে ২০০২ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী।
বিএনপির এই তিন কাণ্ডারি গড় ৪০ বছর বয়সে দলের ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়েছেন। আর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রক্তে গড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের বয়স ৩৮ বছর। রাকিব ২০০৬-০৭ সেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ২০২৪ সালের ২ মার্চ ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পান। বর্তমানে তার কোথাও কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রত্ব নেই। রাকিব ১৯৮৮ সালের ২০ জানুয়ারি জন্মগ্রহন করেন। এ হিসেবে তার বয়স ৩৮ বছর।
গত শনিবার নতুন ঘোষিত ৪৫টি ইউনিটের ছাত্রদল নেতাদের বয়স ৪০ থেকে ৪৫ বছর। ঢাকা মহানগর উত্তরের কমিটিতে সহসভাপতি পদ পেয়েছেন আমার এলাকার ছোট ভাই জাকির হোসেন জাকির। শুনে ভীষণ আনন্দিত হই। সুসংবাদটি জানাতে জাকির ফোন করেছিল। তাকে অভিনন্দন জানাতেই হঠাৎ প্রশ্ন করি, বুড়ো বয়সে ছাত্রদলের নেতা হয়ছো যুবদল ও মূলদল কবে করবে? এমপি, মন্ত্রী ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিবে কবে? কিছুক্ষণ চুপ থেকে জাকির বলে, কমিটি দিবে, দিচ্ছে করে ছাত্রদল করার বয়স অনেক আগে চলে গেছে। দলের শীর্ষ নেতারা ফ্যাসিস্ট আমলে আমার ত্যাগের মূল্যায়ন করেছে। আমার কি করার আছে? ওর প্রশ্নের জবাব আমি দিতে পারিনি।
খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, জাকির ২০০২ সালে এসএসসি পাস করেছে। জাকিরের জন্ম ১৯৮৭ সালের ১ জানুয়ারি। এ হিসেবে তার বর্তমান বয়স ৩৯ বছর চার মাসের বেশি। ২০২০ সালে জাকির বিয়ে করেছে। জাকির এক সন্তানের জনক। অন্তত ১০ বছর আগ থেকে ব্যাংকে চাকরি করে বর্তমানে ব্যবসা করছে। কোথাও কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তার ছাত্রত্ব নেই। বর্তমানে এলাকার একটি মাদরাসার সভাপতি সে।
আমার এলাকার সন্তানদের যেকোনো সাফল্যে আনন্দিত হই। গর্ব করি। ফোন করে উৎসাহ দেই। জাকিরকে ছোট করতে ছাত্রদলের নেতাদের বয়সের উদাহরণটি টানিনি। দেশের এক সময়ের গৌরবময় ছাত্র সংগঠনটির করুণ চিত্র তুলে ধরতে শুধু জাকিরের উদাহরণ দিয়েছি।
গত শনিবার ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন স্বাক্ষরিত একযোগে ৪৫টি ইউনিট কমিটি ঘোষণা করেছে। দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং জেলা ও মহানগরে এসব কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এসব কমিটিতে জাকিরের মতো আরও অসংখ্য নেতা পদ পেয়েছে। তাদের বয়স ৩৫ থেকে ৪০ বছরের উপরে। তবে এসব কমিটিতে জায়গা হয়নি ছাত্রদল করা অনেক ত্যাগী ও নিয়মিত ছাত্রদের। ক্ষুব্ধ হয়ে কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিএনপি অফিস নয়াপল্টনসহ কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভ করেছেন বঞ্চিতরা। তারা স্লোগান দিয়েছেন, “টাকা লাগলে টাকা নে, তবু নাছির নতুন কমিটি দে।”
বঞ্চিত ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দুঃসময়ের ত্যাগী কর্মীদের পদ না দেওয়া হলেও ছাত্রলীগের নেতাদের পদ দেওয়া হয়েছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ২২ সদস্যের কমিটিতে আট জন ছাত্রলীগের পদধারী সাবেক নেতা রয়েছেন। অপর ৪৪টি ইউনিট কমিটিতেও ছাত্রলীগ ও গুপ্ত ছাত্র শিবির ঢুকে পরেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। যা ছাত্রদল তথা বিএনপির জন্য ভয়াবহ বিপদ অপেক্ষা করছে!
ছাত্রদলের প্রধান প্রতিপক্ষ কার্যক্রম নিষিদ্ধ বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, পদপ্রত্যাশীদের বয়স সর্বোচ্চ ২৭ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে । তবে, নিয়মিত সম্মেলন না হওয়ার কারণে বিগত কয়েকটি সম্মেলনে বয়সসীমা ২৯ বছর নির্ধারণ করে ছাড় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত ছাত্রদলের পদপ্রত্যাশীদের বয়স নির্ধারণ করতে পারেনি বিএনপির হাই কামান্ড। বয়স নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় নিয়মিত ছাত্ররা ছাত্রদলের নেতৃত্বে আসতে পারছে না। বুড়ো ও সন্তানের পিতা-মাতারা ছাত্রদলের নেতৃত্বে। এসব পিতা-মাতারা নিয়মিত ছাত্রদের সাথে যোগাযোগ করে দলে টানতে পারছে না। যে কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলের চরম ভরাডুবি হয়েছে। অথচ ছাত্র রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে শিক্ষা, ঐক্য ও প্রগতি-এই তিন মূলনীতিকে ধারণ করে প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। উৎপাদনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা ও ছাত্রসমাজের অধিকার আদায়ের লক্ষ্য সামনে রেখে ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি এই সংগঠন গঠন করেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। পরবর্তী সময়ে বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামের ভ্যানগার্ড হিসাবে পরিচিতি পায় ছাত্রদল। সূচনালগ্ন থেকে সংগঠনটি স্বৈরাচার পতন আন্দোলন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সঠিকভাবে নেতৃত্ব দিয়ে সুনাম অর্জন ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার প্রমাণ দিয়েছে। এজন্য ছাত্রদলকে বলা হত বিএনপির চালিকা শক্তি। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় ১৬ বছরের শাসনামলে হামলা-মামলা-নির্যাতনসহ অসংখ্য নেতাকর্মীকে গুম-খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হতে হয়েছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাদের সঠিক মূল্যায়ন করা হচ্ছে না।
শহীদ জিয়ার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীরা ছাত্রদল করতো। ছাত্র জীবনে আমিও ছাত্রদল করেছি। নেতৃত্ব দিয়েছি। পাঁচ, দশ টাকার রং চা ভাগ করে খেয়ে সংগঠন করেছি। সিনেমা হলের পাস দেয়াই ছিল আমাদের সময়ে ছাত্রনেতাদের সর্বোচ্চ ক্ষমতা। কোনও নেতা টাকা আয়ের চিন্তাও করতো না। ছাত্রদলের নেতারা এখন টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা থেকে শুরু করে নানা কুকর্ম করছে।
আমার কলাপাড়া উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কাজী ইয়াদুল ইসলাম তুষার। জুলাই বিপ্লবের আগে সে একটি এনজিওতে স্বল্প বেতনে চাকরি করতো। শেখ হাসিনার পতনের খবর শুনে ‘রাজ্য দখল’ করতে সব কিছু ফেলে দ্রুত মোটরসাইকেল চালিয়ে কলাপাড়ায় ছুটে যায়। হেলমেট পরার সময়ও তার ছিল না। চাল নেই, চুলা নেই সেই তুষার এখন কয়েক কোটি টাকার মালিক। পায়রা সমুদ্র বন্দর, পায়রা তাপবিদ্যুত কেন্দ্র, কুয়াকাটাসহ বিভিন্ন স্থানে বর্তমানে তার ৩৪ কোটি টাকার কাজ চলছে। ইয়াবা ব্যবসা, ডিজেল পাচারসহ নানা কুকর্মের সাথে জড়িত বিবাহিত এই ছাত্রনেতা। শুধু আমার উপজেলার তুষার রাতারাতি কোটিপতি হয়নি; তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় কমিটির ছাত্রদলের প্রায় সকল নেতারা এখন কোটি কোটি টাকার মালিক।
বর্তমানে বিএনপি ক্ষমতায় থাকলেও ছাত্রদলের অতীতের গৌরব ও সুনাম ফিরিয়ে আনার কোনও উদ্যোগ নেই।
ছাত্রদলের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে হলে প্রকৃত ছাত্রদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দিতে হবে। বিবাহিত ও অছাত্রদের নিয়ে গঠিত কমিটি দ্রুত ভেঙে দিতে হবে। ছাত্রদলে গুপ্ত শিবির ও ছাত্রলীগের প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে ছাত্রদলের নেতা নির্বাচন করতে হবে। কর্মশালা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ নেতা গড়ে তুলতে হবে। যারা ভবিষ্যতে বিএনপির নেতৃত্ব দিবে। বকুলের মতো ব্যক্তিদের বিএনপির নির্বাহী কমিটির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদকের পদ থেকে সরিয়ে দিতে হবে। ক্লিন ইমেজের সাবেক ছাত্রনেতাদের এ পদের দায়িত্ব দিতে হবে।
পরিশেষে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলবো, ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি তুলেছিল জামায়াত। সে দাবির প্রতি সমর্থন দিয়ে আওয়ামী লীগ সারা দেশ অচল করে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল বিএনপিকে। এবারও যেকোনও ইস্যুতে বিএনপিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে মাঠে নামবে গুপ্ত জামায়াত-শিবির। তাদের সাথে যুক্ত হবে আওয়ামী লীগ। রাজপথে তাদের মোকাবেলা করতে ছাত্রদলকে সুসংগঠিত করার বিকল্প নেই।
–লেখক, কানাডা প্রবাসী গণমাধ্যমকর্মী।
© All rights reserved 2022 © aponnewsbd.com
Leave a Reply