উপকূলীয় এলাকায় প্রাথমিক শিক্ষার সংকট | আপন নিউজ

মঙ্গলবার, ০২ Jun ২০২৬, ০৭:৫৫ অপরাহ্ন

প্রধান সংবাদ
উপকূলীয় এলাকায় প্রাথমিক শিক্ষার সংকট

উপকূলীয় এলাকায় প্রাথমিক শিক্ষার সংকট

উপকূলীয় এলাকায় প্রাথমিক শিক্ষার সংকট

একটি উপজেলার সামগ্রিক উন্নয়ন ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের সুবাদে প্রতিদিন মাঠ পর্যায়ের বহুমুখী বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও সুদূরপ্রসারী সংকটের জায়গাটি হলো উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষা। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল একাধারে যেমন প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ, ঠিক তেমনি জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগের দিক থেকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন আর লবণাক্ততার সঙ্গে লড়াই করে এখানকার মানুষকে টিকে থাকতে হয়। এই নিরন্তর জীবন সংগ্রামের সবচেয়ে বড় মাশুল দিতে হচ্ছে আমাদের আগামী প্রজন্মকে; তাদের প্রাথমিক শিক্ষা নানা সংকটের মুখে।

সরকারি শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) এর তথ্যমতে, জাতীয় পর্যায়ে প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার প্রায় ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ। কিন্তু বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারি (APSS) ২০২৪ এর পরিসংখ্যান যখন এই হারকে ১৬.২৫ শতাংশে উন্নীত হতে দেখে, তখন উপকূলীয় প্রান্তিক অঞ্চলের বাস্তবতা আরও শঙ্কা জাগায়। বিভিন্ন গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, উপকূলীয় ও দুর্যোগ প্রবণ এলাকায় এই ঝরে পড়ার হার ১৮ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে। অর্থাৎ, প্রতি চার থেকে পাঁচ জন শিশুর মধ্যে একজন প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার আগেই বিদ্যালয় থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। একজন উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে এই পরিসংখ্যান আমার কাছে শুধু সংখ্যা নয়, বরং শিশুর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হওয়ার দলিল।

মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে এই ঝরে পড়ার পেছনে আমরা প্রধানত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করেছি। প্রথমত, উপকূলের অধিকাংশ পরিবার মৎস্য আহরণ, কৃষি ও দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় চরম অর্থনৈতিক সংকট এখানে নিত্যসঙ্গী। যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে যখন তাদের আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যায়, তখন পরিবারের টিকে থাকার লড়াইয়ে শিশুর শিক্ষা সবার আগে বাদ পড়ে। অনেক অভিভাবক বাধ্য হয়েই সন্তানকে পারিবারিক আয়-উপার্জনের কাজে যুক্ত করে ফেলেন।

দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় রেমাল সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিদ্যালয় ভবনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিংবা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই দুর্যোগজনিত শিক্ষা ব্যাঘাতের ফলে শিক্ষা কার্যক্রম দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থবির হয়ে পড়ে, যা শিশুদের বিদ্যালয়ে ফেরার আগ্রহ কমিয়ে দেয়।

তৃতীয় কারণটি হলো ভৌগোলিক ও যাতায়াত দুর্ভোগ। চরাঞ্চল বা দুর্গম উপকূলীয় এলাকায় শিশুদের দীর্ঘ পথ হেঁটে কিংবা নৌকায় করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বিদ্যালয়ে আসতে হয়। বর্ষা মৌসুমে কাঁচা রাস্তাগুলো কর্দমাক্ত ও যাতায়াতের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি অনিয়মিত হয়ে পড়ে এবং এক পর্যায়ে তারা বিদ্যালয় বিমুখ হয়ে যায়।

চতুর্থত, বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত ও স্যানিটেশন দুর্বলতাও এর জন্য কম দায়ী নয়। অনেক বিদ্যালয়ে এখনো নিরাপদ ভবন ও বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে। বিশেষ করে বড় হয়ে ওঠা শিশু ও কিশোরী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকায় একটি বয়সের পর মেয়ে শিশুদের অনুপস্থিতি ও ঝরে পড়ার হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যায়। এছাড়া সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, সচেতনতার অভাব এবং কন্যা শিশুদের বাল্যবিবাহ দেওয়ার প্রবণতা এখনো এই অঞ্চলে শিক্ষার অন্যতম বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে।

জাতীয় গড়ের তুলনায় উপকূলীয় অঞ্চলে ঝরে পড়ার এ অতিরিক্ত ৫ থেকে ১০ শতাংশের বৈষম্য যদি আমরা এখনই দূর করতে না পারি, তবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি ৪: মানসম্মত শিক্ষা) অর্জন আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার মতো উপকূলীয় উপজেলাগুলোর চিত্রও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে ব্র্যাক বা সেভ দ্য চিলড্রেন এর মতো উন্নয়ন সংস্থাগুলোর অভিজ্ঞতা এবং সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের সমন্বয় ঘটিয়ে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খোঁজা সম্ভব।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের দ্রুত কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলে স্কুল-কাম-আশ্রয়কেন্দ্র মডেলের আধুনিক ও দুর্যোগ সহনশীল প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ করা প্রয়োজন, যেন দুর্যোগের পর দ্রুততম সময়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা যায়। পাশাপাশি শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে পুষ্টিকর মিড ডে মিল বা স্কুল ফিডিং কর্মসূচি এবং বিশেষ উপবৃত্তির পরিধি উপকূলীয় এলাকায় শতভাগ নিশ্চিত করা চাই। প্রতিটি বিদ্যালয়ে ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য পৃথক, আধুনিক ও নিরাপদ স্যানিটেশন এবং বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্গম এলাকার সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের জন্য কমিউনিটি ভিত্তিক ও বিকল্প শিক্ষাকেন্দ্রের মডেল কাজে লাগানো যেতে পারে। একই সাথে, যত্রতত্র গড়ে ওঠা অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা বা কিন্ডারগার্টেনের গুণগত মান এবং নিয়মকানুন কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা দরকার, যেন প্রাথমিক শিক্ষার মূল লক্ষ্য ব্যাহত না হয়।

 

আজকের শিশুই আগামী বাংলাদেশের মূল চালিকাশক্তি। উপকূলের প্রতিকূলতার কাছে হেরে গিয়ে যদি একটি শিশুও প্রাথমিক শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়, তবে তা কেবল সেই পরিবারের ক্ষতি নয়, বরং আমাদের সামগ্রিক জাতীয় অগ্রগতির জন্য একটি বড় অন্তরায়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছি, তবে এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত মনোযোগ। আসুন, উপকূলের প্রতিটি শিশুর জন্য একটি নিরাপদ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করি।

লেখক: কাউছার হামিদ

উপজেলা নির্বাহী অফিসার

কলাপাড়া, পটুয়াখালী।

আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved 2022 © aponnewsbd.com

ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: JPHostBD
error: সাইটের কোন তথ্য কপি করা নিষেধ!!