ভুলতে বসেছি তাদের অবদান! জনপ্রতিনিধিদের এখনই ভাবার সময়

এপ্রিল ০৩ ২০২১, ১৯:৩১

রিপোর্ট-নূরুজ্জামান মামুন।।

পদ্মা-মেঘনা-যমুনায় অনেক জল গড়িয়ে আজ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী তথা ৫০ বছরপূর্তি পালন করছে জাতি। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে, সশস্ত্র সংগ্রামে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। যুদ্ধবিধ্বস্ত ‘তলাবিহীন’ ঝুড়ির কালিমামুক্ত হয়ে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশের তালিকাভুক্ত। বিশ্বব্যাংককে তুড়ি মেরে শতভাগ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতুর নির্মাণকাজ প্রায় শেষের পথে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার সঙ্গে কুয়াকাটার সড়ক যোগাযোগ ফেরিমুক্ত হওয়া সময়ের ব্যাপারমাত্র।

তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রা, পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, অত্যাধুনিক শের-ই-বাংলা নৌঘাঁটি, দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশনসহ কুয়াকাটাকে আন্তজার্তিক মানের পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলতে সরকারের নানা উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ চলছে সাগরপাড়ের কলাপাড়া উপজেলা ঘিরে। এসব কিছুই হচ্ছে জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আজও পদে পদে বীর মুক্তিযোদ্ধারা ব না-লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার ক্ষমতায় থাকলেও মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখা কলাপাড়ার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক মূল্যায়ন করা হয়নি। আগামী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সুযোগ থাকলেও তাদের নামে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা হয়নি বা নির্মিত স্থাপনার নামকরণ করা হয়নি। তবে হঠাৎ করেই স্বাধীনতার এ মাসে বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আবুল হাসেমের নামে একটি ক্ষুদ্র মাছ বাজারের নামকরণ দেখে চমকে উঠেছি। গত ৮ মার্চ বাড়ি থেকে ঢাকা ফেরার পথে চাকামইয়া ব্রিজ সংলগ্ন ওই সাইন বোর্ড চোখে পড়ে। ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করায় অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত শুভবুদ্ধির উদয় হওয়ায় বাজার কমিটি সাইনবোর্ডটি নামিয়ে ফেলেছে। এ ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখা কলাপাড়ার সূর্য সন্তানদের নামে বিভিন্ন স্থাপনার নামকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। ডকুমেন্টারি তৈরি করা যেতে পারে। তা না হলে স্বাধীনতার শতবর্ষ উদযাপনের আগেই মানুষের হৃদয় থেকে মুছে যাবে জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নাম। আগামী প্রজন্মও জানতে পারবে না তাদের অবদানের কথা। এই উপলব্ধি থেকেই আজকের এ লেখা।
শহীদ আলাউদ্দিন:
১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ঢাকায় আইয়ুব বিরোধী মিছিলে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান খান। এ খবর ছড়িয়ে পরলে দেশজুড়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে ছাত্রসমাজ। ২৪ জানুয়ারি আসাদ হত্যার প্রতিবাদে ঢাকার রাজপথে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মতিউর, মকবুল, আলমগীরসহ আরও অনেকে। ছাত্রহত্যার বিচার ও আইয়ুব খানের পদত্যাগের দাবিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠে সারা দেশ। আন্দোলন দমনে স্বৈরাচার আইয়ুব সরকার জারি করে কারফিউ। প্রতিবাদের শহর বরিশালের ছাত্র সমাজ ২৮ জানুয়ারি ১৪৪ ধারা ভেঙে নেমে আসে রাজপথে। তাতে সামিল হন বরিশাল আসমত আলী খান ইনিস্টিটিউশনের দশম শ্রেণির ছাত্র আলাউদ্দিন। অশ্বিনী কুমার টাউন হলের সামনে ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলি চালায় ইপিআর। এসময়ে গুলিবিদ্ধ হন আলাউদ্দিন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে বরিশাল সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই দিন দিবাগত রাতে শাহাদৎবরণ করেন আলাউদ্দিন। আলাউদ্দিনের রক্ত তথা ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সিঁড়ি বেয়েই অর্জিত হয় আমাদের স্বাধীনতা।
আলাউদ্দিনের লাশ বরিশাল থেকে পটুয়াখালী শহরের ল ঘাট সংলগ্ন একটি মাঠে রাখা হয়। পরে তার গ্রামের বাড়ি কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের হাজীপুর গ্রামে সমাহিত করা হয়। এ গ্রামেই ১৯৫২ সালের ১ জানুয়ারি জন্মেছিলেন আলাউদ্দিন।
পরবর্তী সময়ে পটুয়াখালীর ওই মাঠটি আলাউদ্দিনের নামে শহীদ আলাউদ্দিন শিশু পার্ক নামকরণ করা হয়। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই জানে না পার্কটির নামকরণের ইতিহাস। নামে পার্ক হলেও বাস্তবে গো-চারণভ‚মি। শহীদ আলাউদ্দিনের স্মৃতি ভাস্বর করে রাখতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা চাঁদা তুলে কলাপাড়া সিও অফিস (বর্তমানে ইউএনও অফিস) কম্পাউন্ডের ভেতরে একটি স্মৃতিমিনার নির্মাণ করেছিলেন। মিনারের নিচে আলাউদ্দিনের নামে পাঠাগার স্থাপন করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকহানাদাররা মিনারটি ভেঙে ফেলে। দেশ স্বাধীনের পর পূর্ণনির্মাণ করা হয়। মিনারটি স্থানীয়ভাবে শহীদ মিনার হিসাবে ব্যবহৃত হতো। বিভিন্ন জাতীয় দিবসে সর্বস্তরের মানুষ এ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতেন। বর্তমানে কলাপাড়া শিশুপার্কে শহীদ মিনার স্থাপন করায় ¤øান হয়ে গেছে শহীদ আলাউদ্দিনের স্মৃতিস্তম্ভ। অযত্নে পরে থাকা মিনারটির স্থানে ‘মডেল মসজিদ’ নির্মাণের খবর চাউর হয়েছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আবুল হাসেম: উপক‚লের অন্যতম রাজনৈতিক নেতা ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আবুল হাসেম। দেশমাতৃকার এই শ্রেষ্ঠ সন্তান ১৯৩৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি কলাপাড়া উপজেলার টিয়াখালী ইউনিয়নের রজপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫২ সালে তিনি খেপুপাড়া মডেল সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। প্রথমে তিনি টিয়াখালী ইউনিয়নের মেম্বার ও ১৯৬৫ সালে চেয়রম্যান নির্বাচিত হন। ’৬৬-এর ছয় দফা ও ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে বলিষ্ঠ ভ‚মিকা রাখেন। পুরস্কার হিসেবে ১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে কলাপাড়া-আমতলী আসনে আওয়ামী লীগ তাকে মনোনায়ন দেয়। বিপুল ভোটে এমসিএ নির্বাচিত হয়েছিলেন। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পরই নিজ নির্বাচনী এলাকার মুক্তিকামী মানুষদের নিয়ে গঠন করেন সংগ্রম পরিষদ। নিজেই সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিতে এলাকার শতাধিক যুবককে নিয়ে ভারতে যান। কলকাতায় প্রশিক্ষণকালীন প্রবাসী মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কমিটির সদস্য হন তিনি। স্বাধীন দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়নে বিশেষ ভ‚মিকা রাখেন। ১৯৭৭ সালে কলাপাড়া শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহের জেনারেটরটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রতিবাদ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ১৯৮৫ সালে প্রথম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। কর্মজীবনে তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ মুক্তিযোদ্ধা ২০০৯ সালের ১২ ডিসেম্বর বিকেল ৩টায় কলাপাড়া পৌর শহরের নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন। অনগ্রসর কলাপাড়াকে সমৃদ্ধ করার পেছনে তার অবদান শীর্ষে থাকলেও তার কর্ম ও অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে কলাপাড়ায় তার নামে কোনো স্থাপনা নেই।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ মো. মোয়াজ্জেম হোসেন: কলাপাড়ার উন্নয়নের অন্যতম রূপকার বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ মো. মোয়াজ্জেম হোসেন। তিনি ১৯৫৪ সালে কলাপাড়া উপজেলার ধুলাসর ইউনিয়নের চরচাপলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাজীবন শেষ করে ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের মার্চের শেষ সপ্তাহে এক মাসের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে আসেন। এ সময় দেশজুড়ে চলছিল অসহযোগ আন্দোলন। ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকে শুরু হয় বাঙালি নিধন। এ মসয়ে ঘরে বসে থাকতে পারেননি মোয়াজ্জেম হোসেন। পাকিস্তানে না গিয়ে বঙ্গবন্ধুর ডাকে সামরিক প্রশিক্ষণের পুঁজি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। এলাকার যুবকদের নিয়ে গড়ে তোলেন মুক্তিবাহিনী। নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করে দেশ স্বাধীন করেন। নির্বাচিত হন কলাপাড়া থানা কমান্ডার। পরবর্তী সময়ে তিনি কলাপাড়া থানা কৃষক লীগ ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
১৯৭৬-৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি পটুয়াখালী জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালে কলাপাড়া-আমতলী থানার সমন্বয়ে গঠিত পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে মোয়াজ্জেম হোসেনকে উপমন্ত্রীর মর্যাদায় পটুয়াখালী জেলা উন্নয়ন সমন্বকারীর (ডিডিসি) দায়িত্ব দেন। এই মুক্তিযোদ্ধা সমবায়ীদেরও নেতা ছিলেন। তিনি ১৯৯৩-৯৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সমবায় সোসাইটি লিমিটেডের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন কলাপাড়ার রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেও শেষ জীবনে আবার এলাকার রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ২০০৩ সালের ৮ মে কলাপাড়া উপজেলা বিএনপির আহবায়কের দায়িত্ব নেন। ২০০২ সালে ১৫ মার্চ সম্মেলনের মাধ্যমে কলাপাড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন।
২০০২ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজ শেষে কলাপাড়া উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পথে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ওই দিন ১১টা ৫০ মিনিটের সময় তিনি কলাপাড়া হাসপাতালে মারা যান। এই মুক্তিযোদ্ধা ও জনপ্রতিনিধির নামেও কলাপাড়ায় কোনো স্থাপনা নেই।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আ. রাজ্জাক খান: ১৯৫৩ সালের ১৬ মার্চ কলাপাড়ার মহিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আ. রাজ্জাক খান। তিনি মহিপুর কো-অপারেটিভ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু করেন। পরে খেপুপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৭০ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কলাপাড়ায় সফরকালে তার ভ‚য়সী প্রশংসা করেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে ৯ নম্বর সেক্টরে মেজর জলিলের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। আগাঠাকুর পাড়ায় সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়ে পাক হানাদারদের পরাজিত করেন। ১৯৭৩-৭৪ সালে কলাপাড়া থানা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭-৭৮ সালে কলাপাড়া থানা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডর ছিলেন। নেতৃত্বের দক্ষতায় পরবর্তী সময়ে পটুয়াখালী জেলা কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ডাকে তিনি জাতীয় পার্টিতে যোগদান করেন। ১৯৮৬ ও ৮৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই মুক্তিযোদ্ধা জাতীয় পার্টির মনোনয়নে টানা দুবার এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৮৮-৯০ পর্যন্ত জনতা ব্যাংকের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন পদে ছিলেন। ২০১৬ সালের ১৬ জুন এই মুক্তিযোদ্ধা ইন্তেকাল করেন। তিনি এমপি থাকাকালীন এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেন। কিন্তু এই মুক্তিযোদ্ধার নামে এলাকায় কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা হয়নি।
জনপ্রতিনিধিদের কাছে আমার দাবি: উল্লেখিত মুক্তিযোদ্ধাদের সবাই এক সময়ে আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে অন্য দলের মনোনায়নে এমপি নির্বাচিত হলেও জীবদ্দশায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করেছেন। আমার জানামতে, ভিন্নমতের রাজনীতি করলেও কখনো বঙ্গবন্ধু তো দূরের কথা তার পরিবারের কোনো সদস্য সম্পর্কেও বিরূপ মন্তব্য করেননি। মুক্তিযোদ্ধাদের যথার্থ মূল্যায়ন ও সম্মানিত করার দল আওয়ামী লীগ আজ ক্ষমতায়। এ দলটির যোগ্যনেতা অধ্যক্ষ মুহিব্বুর রহমান মুহিব পটুয়াখালী-৪ আসনের এমপি। তিনি প্রতিরক্ষা বিষয়ক সংসদীয় কমিটিরও সদস্য। এ জনপদের জননন্দিত নেতা মাননীয় সংসদ সদস্যের উদ্যোগেই কলাপাড়ার শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চিরস্মরণীয় করে রাখা সম্ভব।
মাননীয় এমপি, রামনাবাদ চ্যানেলে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য বিমান সুবিধাসংবলিত নির্মিয়মান ‘বানৌজা শের-ই-বাংলা’ ঘাঁটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এসব মুক্তিযোদ্ধার নামে নামকরণের প্রস্তাব সংসদে তুলে ধরতে পারেন। প্রতিরক্ষা বিষয়ক সংসদীয় কমিটির মাধ্যমেও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে পারেন। এ ছাড়া পায়রা সমুদ্রবন্দরের বিভিন্ন স্থাপনার নামকরণ কলাপাড়ার শীর্ষ মুক্তিযোদ্ধাদের নামে নামকরণ করা যেতে পারে। পায়রা বন্দর সংলগ্ন প্রস্তাবিত টিয়াখালী-লালুয়া সেতু বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ আবুল হাসেম নামকরণ ভেবে দেখতে পারেন। কলাপাড়া পৌর শহরের শিশু পার্কটির নামকরণ শহীদ আলাউদ্দিনের নামে করলে কেউ আপত্তি তুলবে বলে মনে হয় না। কলাপাড়া জেলা বাস্তবায়নের দাবি আরেক ধাপ এগিয়ে নিতে নীলগঞ্জ ইউনিয়নকে দুই ভাগ করে দক্ষিণাংশের নামকরণ শহীদ আলাউদ্দিনের নামে করলে এলাকার মানুষ সাদরে গ্রহণ করবে।
কুয়াকাটাকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্রে উন্নীত করতে বিমানবন্দর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কমপ্লেক্স, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, জেটি/ল্যান্ডিং স্টেশন, ইকো পার্ক/ফরেস্ট, মেরিন পার্ক, সি অ্যাকুয়ারিয়াম, আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম, গলফ-টেনিস কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনাভুক্ত। এসব স্থাপনা কলাপাড়ার শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামকরণের প্রস্তাব সরকারের কাছে তুলে ধরার এখনই সময়।
মাননীয় কলাপাড়া পৌর মেয়র, শহীদ সুরেন্দ্র মোহন চৌধুরীর মতো অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের নামে কলাপাড়া পৌরশহরের প্রধান সড়কগুলোর নামকরণ করতে পারেন। কুয়াকাটা পৌর মেয়রও একই উদ্যোগ নিতে পারেন। এতে আপনাদের ভোট কমবে না; বরং প্রশংসিত হবেন। কলাপাড়া উপজেলার সরকারি তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নামে তাদের নিজ ইউনিয়নের প্রধান সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনার নামকরণের উদ্যোগ নিতে পারেন চেয়ারম্যানরা। আপনারা উদ্যোগ নিয়ে বাস্তবায়ন করলে ইতিহাসে ভাস্বর হয়ে থাকবেন।
তাদের অপরাধ? কলাপাড়া মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের শ্রদ্ধাভাজন নেতাদের কাছে আমার মন কষ্টের কথা আজ প্রকাশ না করে পারছি না। আমার বাবা সদ্য প্রয়াত একেএম মনিরুজ্জামান সেলিম আপনাদের অনেকের সঙ্গে একসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। একাধিকবার আবেদন করলেও বাবার নাম তালিকাভুক্ত করা হয়নি। বাবা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে তার বড় প্রমাণ আপনারাই। কোন অপরাধে বাবাকে তালিকাভুক্ত করা হয়নি জানালে অন্তত সান্ত¡না পেতাম।
শুধু আমার বাবাই নন; কলাপাড়ার আরও অনেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেও তালিকাভুক্ত হতে পারেনি। তাদের মধ্যে মরহুম মোশাররফ হোসেন বিশ্বাস অন্যতম। ভাষা আন্দোলনের সময়ে গঠিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ছিলেন তিনি। কলাপাড়া থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি থাকাকালীন ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার হয়ে জেল খেটেছেন। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের পর কলাপাড়া-আমতলী এলাকা নিয়ে গঠিত সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মোশাররফ হোসেন বিশ্বাস। তার ছাড়পত্র নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে এলাকার কয়েক জন যুবক ভারতে প্রশিক্ষণের জন্য যান। অথচ মোশাররফ হোসেন বিশ্বাসের নাম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় স্থান পায়নি।
মুক্তিযোদ্ধার তালিকাভুক্ত হতে না পেরে জীবদ্দশায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সদ্য প্রয়াত উপাধ্যক্ষ নুর বাহাদুর তালুকদার স্যার। ‘রাজনীতি কলাপাড়ায় কেমন ছিল কেমন আছে’-শীর্ষক লেখায় তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘আমরা ছয় দফা আন্দোলন থেকে প্রত্যেকটি আন্দোলনে প্রতক্ষ্য অংশগ্রহন করে স্বাধীনতার বিজয় দিবস পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অংশ গ্রহন করি। আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ন করতে যাই। এদিকে মুক্তিযুদ্ধের সনদপত্র ভাগ হয়ে যায়। যে যুদ্ধ নামের বিষয়টি কল্পনাও করে নাই সেও সনদ পেল। আর আমি তিনবার দরখাস্ত করে সনদ পেলাম না। এর সাথে আরও দুটি নাম যাদের অবদান মুক্তিযুদ্ধে অনেক। তারাও সনদ পায়নি। যেমন-মাহবুবুর রহমান তালুকদার (এমপি) ও আমজাদ হোসেন হাওলাদার।’
 ২৬ মার্চ-২০২১, মহান স্বাধীনতা দিবসের আপন নিউজে প্রকাশিত।

আমাদের ফেসবুক পেজ




Flag Counter


error: সাইটের কোন তথ্য কপি করা নিষেধ!!